প্রিন্ট এর তারিখঃ Jun 3, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ May 5, 2026 ইং
৩৮ দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে হার মানলেন বাবা; ফোন করে ছেলে বললেন, "আমি আসব না, দাফন করে দিন"

শেখ সাদী সুমন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতি নিধী
ব্রাহ্মণবাড়িয়া: পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম বাক্যটি সম্ভবত এবার শোনা গেল ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে। দীর্ঘ ৩৮ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন খোকন মিয়া (৫০)। কিন্তু চারদিন ধরে মর্গে পড়ে থাকা বাবার লাশ নিতে আসেনি কোনো সন্তান। শেষমেশ ছোট ছেলে রানা ফোন করে জানালেন, "আমি আসব না, আপনারা দাফন করে দিন।"
রক্তের সম্পর্কের এমন চরম অবহেলা আর নির্মমতায় স্তব্ধ হয়ে গেছে হাসপাতাল এলাকা ও স্থানীয় সচেতন মহল।
কী ঘটেছিল খোকন মিয়ার ভাগ্যে?
গত ২৪ মার্চ গুরুতর শারীরিক সংক্রমণ (সেলুলাইটিস) নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন খোকন মিয়া। হাসপাতালের নার্স এবং মানবিক সংগঠন 'ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর'-এর সদস্যরা দিনরাত তার সেবা করেছেন। কথা বলতে কষ্ট হতো তার, তবুও অস্পষ্ট স্বরে নিজের নাম আর ঠিকানার কথা জানিয়েছিলেন। সেই সূত্র ধরে পরিবারকে খুঁজে বের করা হলেও মেলেনি কোনো ভালোবাসা। সন্তানদের নির্মমতা খোকন মিয়ার স্ত্রী নিলুফা আক্তার এবং দুই ছেলে রাজু ও রানা গত ১০-১২ বছর ধরে তার সাথে কোনো যোগাযোগ রাখেননি। বাবার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তারা সাফ জানিয়ে দেন, তারা মরদেহ গ্রহণ করবেন না।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন 'বাতিঘর' থেকে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া এবং দাফনের যাবতীয় খরচ বহনের প্রতিশ্রুতি দিয়েও ছেলেদের মন গলানো যায়নি। ফোনের ওপার থেকে ছেলের নির্লিপ্ত উত্তর ছিল— বাবার লাশ দাফন করে দিতে, তারা কেউ আসবে না। শেষ বিদায় হবে বেওয়ারিশ হিসেবেই
মরদেহটি চারদিন ধরে মর্গে পড়ে ছিল এই আশায় যে, হয়তো শেষ মুহূর্তে কোনো সন্তানের টান জেগে উঠবে। কিন্তু সেই আশার গুড়ে বালি। অবশেষে আজ মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে 'ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর'-এর উদ্যোগে খোকন মিয়াকে 'বেওয়ারিশ' হিসেবেই দাফন করা হচ্ছে।
এক নজরে হৃদয়বিদারক এই ঘটনা:
নিহতের নাম: খোকন মিয়া (৫০)।
পৈতৃক নিবাস: লক্ষ্মীপুর (শ্বশুরবাড়ি কুমিল্লার দেবিদ্বারে)।
হাসপাতালে অবস্থান: ৩৮ দিন টানা চিকিৎসাধীন ছিলেন।
পরিবারের অবস্থান: স্ত্রী ও দুই ছেলেই মরদেহ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
সমাজের এই চরম নৈতিক অবক্ষয় দেখে হাসপাতালের ইনচার্জ তাহমিনা আক্তার বলেন,
"আমরা তাকে বাঁচিয়ে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কিন্তু মৃত্যুর পর তার আপনজনদের এমন আচরণ আমাদের বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে।"
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ দৈনিক ভোরের কথা