
মতিউল ইসলাম কক্সবাজার
বেশি বেশি গাছ লাগান এবং পরিবেশ বাঁচান সেই স্লোগান এখন বিলুপ্তের পথে। রক্ষক যখন বক্ষকে পরিণত হয় তাহলে আর করার কিছুই থাকেনা। এমন এক চিত্র দেখা গেছে,
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের রাজারকুল রেঞ্জের দারিয়ার দীঘি বিটে সরকারি বনভূমি দখল, পাহাড় কেটে বিক্রি এবং অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, একটি সংঘবদ্ধ দখলচক্র রেঞ্জ ট্রেনিং অভিউজ্জমান নিবিড় কে ‘ম্যানেজ’ করে প্রকাশ্যে এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র ও সরেজমিনে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, রাজারকুল রেঞ্জে
দারিয়ার দীঘি বিটের পাইন বাগান এলাকা ১০ একর বনভূমিতে দখল বিক্রি করে অর্ধ কোটি টাকার মালিক নুরু মোস্তাফা , এতে লাভবান হন রেঞ্জ কর্মকর্তা অভিউজ্জমান। এভাবে টোংগাডেবা, বাদিতলা ঘোনারপাড়া, জামবাগান কাছিম আলীর ঘোনা এলাকায় মৃত কাছিম আলীর পুত্র রহিম উল্লাহ ও রহিদ উল্লাহ প্রায় ১৫ একর বন বিভাগের জমি দখল করে সুপারি বাগান, পানের বরজ, কলা বাগানসহ বিভিন্ন ফলজ বাগান গড়ে তুলেছেন। পাশাপাশি সেখানে একাধিক বসতঘরও নির্মাণ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, দখলদাররা শুধু বনভূমি দখলেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং পাহাড়ি জমি খণ্ড খণ্ড করে বিক্রিও করছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই বছর আগে জমির উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি ৪০ শতক বনভূমির পাহাড় দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করে দখল হস্তান্তর করেন। পরবর্তীতে গত এক বছরে কক্সবাজারের এক ব্যবসায়ীর কাছে ৬০ শতক পাহাড়ি জমি তিন লাখ টাকায় বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর আগেও আবুল বশর নামের এক যুবকের কাছে ঘরসহ ১০ শতক জমি এক লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জামবাগান কাছিম আলীর ঘোনা ছাড়াও দারিয়ার দীঘি বিটের পাইন বাগান, টোংগাডেবা ও বাদিতা ঘোনারপাড়া এলাকায় বনভূমি দখল, পাহাড় কাটা, বাগান তৈরি এবং অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। এসব এলাকায়ও একটি চক্র বন বিভাগের জমি দখল করে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, এসব অবৈধ দখল ও বেচাকেনার পেছনে বন বিভাগের একটি চিহ্নিত দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে। তাদের মাধ্যমেই রেঞ্জ কর্মকর্তা অভিউজ্জমানের কাছে নিয়মিত টাকা পৌঁছে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। অর্থের বিনিময়ে দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। বরং টাকা না দিলে উচ্ছেদের নামে হয়রানি করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে রাজারকুল রেঞ্জের রেঞ্জ ট্রেনিং কর্মকর্তা অভিউজ্জমান এর। স্থানীয়দের দাবি, তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা ছাড়া এত বড় পরিসরে বনভূমি দখল, পাহাড় বিক্রি ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ সম্ভব নয়।
স্থানীয়রা আরও জানান, গত ২৫ এপ্রিল নতুন করে একটি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে বিক্রির উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনাতেও বিট কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী।
এ বিষয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগের পরও “ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে” বলে সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে। এমনকি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং ঘটনাগুলো ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
এদিকে অভিযুক্তরা নিজেদের আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমেও বনভূমি দখল সম্প্রসারণ করছে বলে জানা গেছে। এতে দিন দিন বনাঞ্চল সংকুচিত হচ্ছে এবং পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।
এ বিষয়ে দারিয়ার দীঘি বিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইরফান শিহাবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “বিষয়টি দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
রাজারকুল রেঞ্জ কর্মকর্তা অভিউজ্জামান নিবিড় বলেন, “কাছিম আলীর ঘোনা,পাইন বাগান এলাকায় দুই এলাকার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দখল বানিজ্যে বিরোধ চলছে। বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা জটিল এবং একপক্ষ অপর পক্ষকে দখল দিচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে আমি এখনো সরেজমিনে ঘটনাস্থলে যাইনি।
রাজারকুল রেঞ্জের দারিয়ার দীঘি বিটে বনভূমি দখল, পাহাড় কেটে বিক্রি এবং প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার এমন অভিযোগ জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সচেতন মহল দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দখলদার, দালালচক্র এবং জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।