প্রিন্ট এর তারিখঃ Jun 3, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ May 12, 2026 ইং
কক্সবাজারে শিক্ষিত বেকারের দীর্ঘশ্বাস সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে বঞ্চনার অভিযোগ

মতিউল ইসলাম (কক্সবাজার)
পর্যটন নগরী কক্সবাজার এখন উন্নয়নের রোল মডেল। মেগা প্রকল্পের ঝনঝনানি আর শত শত এনজিওর পদচারণায় মুখর এই জেলা। কিন্তু এই চাকচিক্যের আড়ালে চাপা পড়ে আছে জেলার হাজার হাজার উচ্চ শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ যুবকের দীর্ঘশ্বাস। সরকারি চাকরিতে বঞ্চনার ইতিহাস তো পুরনো, এখন নিজ জেলায় বেসরকারি বা এনজিওর চাকরিতেও অধিকার হারাচ্ছেন এই মাটির সন্তানেরা।
এনজিওতে নিয়োগের মহোৎসব, কিন্তু স্থানীয়রা বঞ্চিত প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত কক্সবাজারে কর্মরত বিভিন্ন এনজিওতে অন্তত এক থেকে দেড় হাজার পদে জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, এই পদগুলোর বড় একটি অংশে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দেওয়া হলে বেকারত্বের হার অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ে চলে আসত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। দাতা সংস্থা বা উচ্চপর্যায়ে যে কয়জন স্থানীয় কর্মরত আছেন, তারা নিজেদের টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছেন; স্থানীয়দের জন্য কথা বলার সক্ষমতা বা সদিচ্ছা কোনোটাই তাদের নেই।
নেতৃত্বের নীরবতা ও 'স্থানীয়করণ' নীতির পরাজয় জেলায় বর্তমান সরকারের চারজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় শ্রমবাজারের এই অস্থিরতা কাটছে না। সচেতন মহলের মতে, জনপ্রতিনিধিদের একটি কঠোর নির্দেশ বা তদারকিই পারত এনজিওগুলোকে স্থানীয় জনশক্তি ব্যবহারে বাধ্য করতে। কিন্তু 'টেকসই উন্নয়ন' আর 'লোকালাইজেশন' বা স্থানীয়করণের বুলি শুধু কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।
হোটেল-রেস্তোরাঁতেও অবহেলিত স্থানীয়রা কক্সবাজার জেলায় প্রায় এক হাজার হোটেল ও গেস্ট হাউস রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানের অন্তত ৮০ শতাংশ কর্মসংস্থান স্থানীয়দের হওয়ার কথা থাকলেও চিত্র ঠিক উল্টো। আজ শহরের একটি আধুনিক রেস্তোরাঁয় গিয়ে দেখা যায়, শতভাগ কর্মচারী পার্বত্য অঞ্চলের। অথচ রেস্তোরাঁটির মালিক স্থানীয় এবং গ্রাহকদের বড় অংশও এই জেলার বাসিন্দা। এই বৈষম্য স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করছে।
চেম্বার অব কমার্সের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আজ কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে স্থানীয় জনশক্তি কাজে লাগানোর বিষয়ে কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত বা আলোচনা হয়নি বলে জানা গেছে। ফলে শিক্ষিত সমাজের কাছে এটি এক ধরনের 'প্রতারণা' হিসেবেই জপ্রতীয়মান হচ্ছে।
ভুক্তভোগীর বক্তব্য চাকরিপ্রত্যাশী একজন উচ্চ শিক্ষিত যুবক মুরাদ হাসান (যার ১০ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে) আক্ষেপ করে বলেন:"সকাল থেকে অন্তত ১০ জন বন্ধুর সাথে কথা বলেছি, যারা সবাই অভিজ্ঞ এবং উচ্চ শিক্ষিত। কিন্তু আজ আমরা সবাই বেকার। হাজার হাজার পদের সার্কুলার হয়, অথচ আমাদের কপালে জোটে না। মনে হচ্ছে নিজ জেলাতেই আমরা আজ শরণার্থী।"
সুশীল সমাজের অভিমত কক্সবাজারের একজন বিশিষ্ট নাগরিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ফলজুল কাদের চৌধুরী বলেন: "স্থানীয়দের কর্মসংস্থান নিশ্চিত না করে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এনজিও এবং পর্যটন খাত যদি স্থানীয়দের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করে, তবে অদূর ভবিষ্যতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পরিবেশ ও সামাজিক শৃঙ্খলার ওপর। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের এখনই এই বিষয়ে কঠোর হওয়া উচিত।"
কক্সবাজারের শিক্ষিত যুবসমাজ আর মিথ্যে আশ্বাস চায় না। তারা চায় কর্মক্ষেত্রে তাদের ন্যায্য অধিকার। যদি অতি দ্রুত স্থানীয়দের জন্য কোটা বা অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা না হয়, তবে এই ক্ষোভ বড় ধরনের সামাজিক অসন্তোষে রূপ নিতে পারে।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ দৈনিক ভোরের কথা