
শেখ সাদী সুমন জেলা প্রতি নিধী ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২০ মে ২০২৬
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিএনজি চালিত অটোরিক্সার ভেতরে যাত্রীবেশে থাকা একদল দুর্ধর্ষ ও পেশাদার অপরাধী চক্রের হাতে নৃশংসভাবে খুন হন জাহানারা বেগম। ক্লু-লেস এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে উন্মোচন করেছে জেলা পুলিশ।
ঘাতক সিএনজির পেছনে লেখা একটিমাত্র নাম—“মা বাবার দোয়া আয়াত পরিবহন”—এই সূত্র ধরেই টান দিয়ে পুরো সিন্ডিকেটকে টেনে বের করেছে পুলিশ। নারীসহ গ্রেফতার করা হয়েছে ৪ জন পেশাদার খুনি ও ছিনতাইকারীকে।
চলন্ত সিএনজিতেই চলে পাশবিকতা!
গত ১৪ মে ২০২৬ তারিখ দুপুরে সদর থানার কুমারশীল মোড় থেকে আশুগঞ্জের নিজ বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সিএনজিতে উঠেছিলেন দুর্ভাগ্যগ্রস্ত জাহানারা বেগম। তিনি জানতেনও না, সিএনজি চালকসহ ভেতরে থাকা বাকি যাত্রীরা কোনো মানুষ নয়, রক্তপিপাসু একদল হায়েনা।
পথিমধ্যে নির্জন রাস্তায় চক্রটি জাহানারা বেগমের সোনা-গহনা ও টাকা ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে। সাহসী এই নারী যখন বাধা দেন এবং চিৎকার শুরু করেন, তখনই নরপিশাচরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
চলন্ত গাড়ির ভেতরেই তাকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে রক্তাক্ত করা হয়। এরপর বিকেল ৫:২০ মিনিটের দিকে সদর থানার অষ্টগ্রাম এলাকায় রাস্তার পাশে তাকে ছুড়ে ফেলে পালিয়ে যায় ঘাতকেরা। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই ঘটনায় নিহতের ছেলে জুবায়েদুর রহমান খান ইমন বাদী হয়ে ১৮ মে সদর থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
সিসিটিভি ফুটেজ ও পুলিশের চিরুনি অভিযান
মামলা হওয়ার পরপরই মাঠে নামে সদর মডেল থানা পুলিশ। কুমারশীল মোড়সহ আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা করে একটি সিএনজির সন্ধান মেলে, যার পেছনে লেখা ছিল “মা বাবার দোয়া আয়াত পরিবহন”।
ব্যস, এই এক ক্লু ধরেই ১৮ মে দুপুর থেকে শুরু হয় পুলিশের ঝটিকা অভিযান:
ঘাতক সিএনজি চালক বাদশা: ১৮ মে দুপুর ১:৩০ মিনিটে ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি গ্যারেজ থেকে ঘাতক সিএনজিটি জব্দসহ চালক মো. বাদশাকে গ্রেফতার করা হয়।
মূল কসাই শরীফ উদ্দিন: চালক বাদশার স্বীকারোক্তিতে ওই দিনই সন্ধ্যা ৬:৩০ মিনিটে উত্তর পৈরতলা এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় শরীফকে। তার কাছ থেকে উদ্ধার হয় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা ২টি ছুরি।
লুটেরা নারী রিমা আক্তার: শরীফের দেওয়া তথ্যে রাত ৮টার দিকে সুলতানপুর থেকে গ্রেফতার করা হয় রিমা আক্তারকে। এই পিশাচী এতটাই নিষ্ঠুর যে, জাহানারা বেগমকে খুন করার পর তার গা থেকে খুলে নেওয়া সেলোয়ার, ওড়না ও জুতা নিজেই পরিধান করে ঘুরে বেড়াচ্ছিল! পুলিশ তার শরীর থেকেই নিহতের কাপড় উদ্ধার করে।
জোবায়ের হোসেন ওরফে হৃদয়: শরীফের বাসা থেকে রাত ১১:৩০ মিনিটে উদ্ধার করা হয় হত্যাকাণ্ডের সময় হৃদয়ের পরিহিত থাকা রক্তমাখা জিন্স প্যান্ট।
খুনিরা সবাই দাগি অপরাধী: কার নামে কয় মামলা?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গ্রেফতারকৃত এই ৪ জন কোনো সাধারণ ছিনতাইকারী নয়, এরা প্রত্যেকেই একেকজন আইনের চোখে দাগি ও ফেরারি আসামি:
১. জোবায়ের হোসেন প্রকাশ হৃদয়: হত্যা, ডাকাতি, ধর্ষণ ও মানবপাচারসহ ৭টি ভয়ঙ্কর মামলার আসামি।
২. মো. শরীফ উদ্দিন: নারী ও শিশু নির্যাতন এবং মাদকসহ ৭টি মামলার আসামি।
৩. মো. বাদশা (সিএনজি চালক): ২টি মাদক মামলার আসামি।
৪. রিমা আক্তার: ১টি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার আসামি।
আদালতে পাপ স্বীকার: গ্রেফতারকৃত আসামিদের ১৯ মে ২০২৬ তারিখে আদালতে সোপর্দ করা হলে, মূল ঘাতক মো. শরীফ উদ্দিন হত্যাকাণ্ডে নিজের সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে বিজ্ঞ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
জেলা পুলিশের কড়া বার্তা
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ (মিডিয়া উইং) জানিয়েছে, এই ধরণের সংঘবদ্ধ অপরাধীদের পুরোপুরি নির্মূল করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চলাচলকারী সকল সিএনজি, অটোরিক্সা এবং চালকদের একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা হবে। কোনো অপরাধী যেন চালকের বেশে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে, সেজন্য কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।