
ব্যর্থতার দায়ে খন্দকার রাশেদ মাকসুদ খানের নেতৃত্বাধীন কমিশনকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) থেকে অপসারণ করার পর গত ৪ জুন মাসুদ খানকে চেয়ারম্যান করে নতুন কমিশন নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এরপর কিছুদিন শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেলেও গত এক মাসের টানা পতনে বাজার আবার মাসুদ খানের আমলের অবস্থায় ফিরে গেছে। বরং পরিসংখ্যান বলছে, মাসুদ খান দায়িত্ব ছাড়ার সময় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সূচক যে অবস্থানে ছিল, বর্তমান সূচক তার চেয়েও নিচে নেমে এসেছে। স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
মাসুদ খান দায়িত্ব নেওয়ার আগে গত ৩ জুন ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ছিল ৫৪৪২ পয়েন্ট। রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) তা ৯৭ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৫৪১৯ পয়েন্টে। অর্থাৎ সূচকটি মাসুদ খানের রেখে যাওয়া অবস্থান থেকেও নিচে নেমে গেছে, যা স্পষ্ট করে দেয় যে কমিশন পরিবর্তনের পরও বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা কাটেনি এবং দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি।
গত সপ্তাহের হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সপ্তাহটি শুরু হয়েছিল রবিবার ১০৪ পয়েন্টের বড় ধস দিয়ে। এরপর সোমবার অনেক চেষ্টায় সূচক বেড়েছিল মাত্র ৯ পয়েন্ট, যা কার্যত আগের দিনের পতনের তুলনায় নগণ্য। এরপর মঙ্গলবার ২৮ পয়েন্ট, বুধবার ১ পয়েন্ট ও বৃহস্পতিবার ২৩ পয়েন্ট কমেছে। অর্থাৎ সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে চার দিনই সূচক নিম্নমুখী ছিল, যা বাজারে টানা আস্থাহীনতার ইঙ্গিত দেয়।
এর আগের সপ্তাহে চিত্রটা ছিল মিশ্র। বৃহস্পতিবার ২ পয়েন্ট, বুধবার ২৩ পয়েন্ট ও মঙ্গলবার ৩৯ পয়েন্ট বেড়েছিল, যা দেখে সাময়িকভাবে মনে হতে পারত বাজার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু ওই সপ্তাহেরই সোমবার ১৬ পয়েন্ট ও রবিবার ৪১ পয়েন্ট কমে যাওয়ায় সপ্তাহ শেষে প্রকৃত লাভ তেমন থাকেনি। এই ধরনের ওঠানামা বলে দেয়, বাজারে যেকোনো উত্থান স্থায়ী হচ্ছে না এবং সামান্য ইতিবাচক প্রবণতা দেখা দিলেই সপ্তাহের শুরুর দিকে বড় পতনে তা মুছে যাচ্ছে।
তারও আগের সপ্তাহে চার কার্যদিবসের মধ্যে কেবল বৃহস্পতিবার ১৬ পয়েন্ট বেড়েছিল, বাকি তিন দিন—মঙ্গলবার ৩ পয়েন্ট, সোমবার ৭৯ পয়েন্ট ও রবিবার ৬৪ পয়েন্ট—কমেছে। আর তারও আগের সপ্তাহে বৃহস্পতিবার ১৬ পয়েন্ট বাড়লেও তার আগের টানা ছয় কার্যদিবসের পতনে সূচক কমেছিল মোট ১৩৪ পয়েন্ট। এই চার সপ্তাহের ধারা পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, সপ্তাহের শুরুর দিকে (বিশেষত রবি-সোমবার) বড় পতন এবং সপ্তাহের শেষভাগে সামান্য সংশোধন—এই প্যাটার্নটি বারবার ফিরে আসছে, যা সামগ্রিকভাবে সূচককে নিম্নমুখী প্রবণতাতেই রেখে দিচ্ছে।
লেনদেনের দিক থেকে দেখা যায়, আজ ডিএসইতে ৫৭১ কোটি ৩২ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে, যা আগের দিনের ৫৪৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকার তুলনায় ২৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা বা ৫ শতাংশ বেশি। তবে এই লেনদেন বৃদ্ধিকে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখার সুযোগ কম, কারণ একইদিনে দরপতনও হয়েছে ব্যাপকভাবে। ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৮৪টি কোম্পানির মধ্যে দর বেড়েছে মাত্র ২৭টির বা ৭.০৩ শতাংশের, আর দর কমেছে ৩৩৬টির বা ৮৭.৫০ শতাংশের, অপরিবর্তিত ছিল ২১টি বা ৫.৪৭ শতাংশের দর। এই অনুপাত থেকে বোঝা যায়, লেনদেন বৃদ্ধির পেছনে মূলত বিক্রির চাপই কাজ করেছে, ক্রেতাদের নতুন আগ্রহ নয়।
একই দিনে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) নেতিবাচক চিত্র দেখা গেছে। রবিবার সিএসইতে ১৪ কোটি ২৪ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে, যেখানে আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। লেনদেন হওয়া ২০১টি কোম্পানির মধ্যে দর বেড়েছে ৪৫টির, কমেছে ১৩৮টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ১৮টির। সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১৫০ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৪৭১৬ পয়েন্টে, যেখানে আগেরদিন সূচক কমেছিল মাত্র ২ পয়েন্ট। অর্থাৎ সিএসইতেও পতনের গতি হঠাৎ করে অনেক বেড়ে গেছে।
সব মিলিয়ে দুই এক্সচেঞ্জের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সমস্যাটি কোনো একক এক্সচেঞ্জ বা প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামগ্রিক বাজার আস্থার সংকট। কমিশন বদলের পর স্বল্পমেয়াদী যে উত্থান দেখা গিয়েছিল, তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে বাজার এখনো সংগ্রাম করছে বলেই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইয়াসিন আরাফাত,