সালথায় ১০ গ্রামের মাঠ রক্ষায় একাট্টা জনতা; প্রশাসন ও পুলিশের কঠোর অবস্থান, জমির দাবিদারদের কাছে কাগজপত্র তলব।
"এই মাঠটাই আমাদের নিঃশ্বাস, আমাদের জগৎ। এটা কেড়ে নিলে আমরা কোথায় যাবো?"— কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই নিজের আকুতি জানাচ্ছিল ফরিদপুরের সালথার উত্তর চণ্ডীবরদী গ্রামের তরুণ খেলোয়াড় তামিম। শুধু তামিম নয়, তার মতো প্রায় ১০টি গ্রামের শত শত শিশু-কিশোরের স্বপ্ন আর কৈশোরের একমাত্র ঠিকানা এই খেলার মাঠটি আজ প্রভাবশালীদের দখলে যাওয়ার মুখে। তবে মাঠটি রক্ষায় এবার দলমত নির্বিশেষে ফুঁসে উঠেছে জনতা। খেলোয়াড়, এলাকাবাসী ও রাজনৈতিক নেতারা একাট্টা হওয়ায় অবশেষে কঠোর অবস্থান নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ। সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে— আগে জমির মালিকানার ফয়সালা হবে, তারপর অন্য কথা।
ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে প্রায় ১৭ বছর ধরে এলাকার তরুণ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে এই মাঠ। সম্প্রতি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের প্রভাবশালী একটি মহল মাঠটিতে বেড়া দিয়ে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে গেলে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়।
মাঠের নিয়মিত খেলোয়াড় রাসেল ও হাসিব বলেন, "আমরা খেলাধুলা করে সুস্থভাবে বাঁচতে চাই। মাঠ না থাকলে তরুণরা মাদকের মতো সর্বনাশা পথে পা বাড়াতে পারে। আমরা আমাদের খেলার অধিকার ফেরত চাই।"
এলাকাবাসী লিটু শেখ ও জামাল সরদার বলেন, "আমাদের চোখের সামনে এই মাঠ বেড়ে উঠেছে। হঠাৎ করে কেউ এসে দখল করে নেবে, এটা আমরা কিছুতেই হতে দেব না। প্রয়োজনে কঠোর আন্দোলন হবে।"
তরুণদের এই আর্তনাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাও। ইউনিয়ন বিএনপি'র সভাপতি মুজিবুর রহমান মাস্টার এবং উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহিন বলেন, "এটি কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের প্রশ্ন। এই মাঠ রক্ষায় আমরা এলাকাবাসীর পাশে আছি।"
বিষয়ে সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আনিছুর রহমান বালী বলেন, “উত্তর চণ্ডীবরদী গ্রামের একটি খেলার মাঠ দখলের অভিযোগ আমরা পেয়েছি। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। এখানে যদি সরকারের কোনো স্বার্থ থেকে থাকে, আমরা অবশ্যই খেলার মাঠটি দখলমুক্ত করে তরুণদের জন্য উন্মুক্ত রাখব।”
এদিকে, কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে সালথা থানা পুলিশ। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতাউর রহমান একটি সুস্পষ্ট ও নিরপেক্ষ অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা জমির দাবিদারদের ডেকেছি। তাঁদের স্পষ্ট বলা হয়েছে, আগে সড়ক ও জনপথ বিভাগ থেকে জমির মালিকানার সঠিক কাগজপত্র হাজির করুন। জমি যদি সরকারি হয়, তবে ছেলেপেলেরাই এখানে ফুটবল খেলবে। আর যদি আইনগতভাবে এটি কারো ব্যক্তিগত মালিকানাধীন প্রমাণিত হয়, তবে তারা সেটি ব্যবহার করতে পারবে। এর আগে কোনো ধরনের দখল বা কার্যক্রম চলবে না।”
ওসি জানান, জমির দাবিদারদের অন্যতম নিলুফা আক্তার এবং শাহিন সরদারকে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে বিষয়টির একটি স্থায়ী সমাধান করা হবে।
প্রশাসনের এই দ্বিমুখী কঠোর অবস্থানের পর কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে এলাকাবাসীর মধ্যে। তবে মাঠ পুরোপুরি দখলমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত শঙ্কা কাটছে না। তরুণ খেলোয়াড়দের চোখেমুখে এখন একটাই অপেক্ষা— কবে ফয়সালা শেষে তাদের প্রিয় মাঠটিতে আবার ফিরবে ফুটবলের সেই চিরচেনা কোলাহল।