
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতির এক জটিল চিত্র আবারও সামনে এসেছে। কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (CAAB) ফ্লাইট অপারেশন ইনস্পেক্টর ক্যাপ্টেন আজিজ আব্বাসি রফিক। তাঁর বিরুদ্ধে লাইসেন্স জালিয়াতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক দুর্নীতির অভিযোগে সম্প্রতি সেফটি বিভাগ তদন্ত শুরু করেছে।
তবে এই বিতর্ক নতুন নয়। ২৪ বছর আগে, ২০০১ সালে, বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমি অ্যান্ড জেনারেল অ্যাভিয়েশন লিমিটেডে (BFA & GA) প্রশিক্ষণার্থী অবস্থাতেই আজিজ সরকারি ভর্তুকি কেলেঙ্কারির কেন্দ্রে ছিলেন।
⸻
সরকারি ভর্তুকি আত্মসাতের অভিযোগ (২০০১)
রেকর্ড অনুযায়ী, প্রশিক্ষণের জন্য আজিজ জমা দেন ২,১৬,৭৫৪ টাকা। অথচ সরকারি ভর্তুকি হিসাবে CAAB থেকে পান ২,৬৮,৫০০ টাকা— অর্থাৎ নিজের জমার চেয়ে ৫১,৭৪৬ টাকা বেশি। অভিযোগ উঠেছে, সেই অতিরিক্ত সরকারি অর্থ আজও ফেরত আসেনি।
তৎকালীন প্রধান ফ্লাইং ইন্সট্রাক্টর (CFI) ছিলেন আজিজের বাবা ক্যাপ্টেন রফিকুর রহমান। প্রশিক্ষণকালীন সময়ে তিনিই ছিলেন সন্তানের সরাসরি মূল্যায়নকারী, ফলে First Solo Flight, Cross Country Flight, CPL/ATPL General & Navigation Check সহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় বাবার প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল। এটি প্রকাশ্য স্বজনপ্রীতির উদাহরণ।
ফলে আজিজ এক বছরেরও কম সময়ে CPL প্রশিক্ষণ শেষ করেন— যা সাধারণ প্রশিক্ষণ সময়ের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত, এবং নামমাত্র খরচে সর্বোচ্চ ভর্তুকি সুবিধা পান।
⸻
রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও প্রশাসনিক সহায়তা
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, আজিজ আওয়ামী ঘরানার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। ২০২১ সালে তিনি “সিনিয়র ফ্লাইট অপারেশন্স ইনস্পেক্টর (ফিক্সড উইং)” পদে নিয়োগ পান তৎকালীন MFSR গ্রুপ ক্যাপ্টেন চৌধুরী এম ডি জিয়া উল কবিরের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়।
উল্লেখ্য, গ্রুপ ক্যাপ্টেন জিয়া উল কবির ছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ADC এবং পরবর্তীতে CAAB-এ দায়িত্ব পালনের সময় একাধিক দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হন। বর্তমানে তিনি পলাতক বলে জানা গেছে।
আজিজের ভগ্নীপতি একজন আইনজীবী, যিনি শেখ ফজলে নূর তাপসের ল’ ফার্ম এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স উভয় প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত। এই জবাবদিহিমূলক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আজিজ প্রতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও দুর্নীতির সুবিধা ভোগ করে আসছেন।
⸻
CAR ’84 এর লঙ্ঘন – আইনি নোটিশে উল্লেখিত অভিযোগ
আইনি নোটিশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ক্যাপ্টেন আজিজ অন্তত ছয়টি গুরুতর নিয়ম ভঙ্গ করেছেন—
১. Rule 24(1)(a) – বয়সের শর্ত লঙ্ঘন
CPL অর্জনের জন্য ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর। কিন্তু আজিজ ১৭ বছর ৬ মাস বয়সে ফ্লাইট চেক সম্পন্ন করেন।
২. Rule 24(3)(a)(i) – P1 সময় জালিয়াতি
CPL-এর জন্য ১৫০ ঘণ্টা P1 সময় আবশ্যক। আজিজ লগবুকে ১৫০ ঘণ্টা দেখালেও, এর মধ্যে ২ ঘণ্টা ছিল কো-পাইলট সময়। ফলে বৈধ সময় মাত্র ১৪৮ ঘণ্টা।
৩. Rule 24(3)(a)(ii)(c) – Instrument Training ঘাটতি (CPL)
CPL-এর জন্য প্রয়োজনীয় ১০ ঘণ্টা Instrument Instruction Training-এর বিপরীতে করেছেন মাত্র ৩ ঘণ্টা ২০ মিনিট।
৪. Rule 26(3)(a)(ii)(A) – PIC সময় জাল করে ATPL আবেদন
অপূর্ণ ও অবৈধ P1 সময়কে PIC হিসেবে গণনা করে ATPL-এর জন্য আবেদন করেন।
৫. Rule 32(2)(b)(ii)(B) – Instrument Flight Time ঘাটতি (ATPL)
প্রয়োজন ছিল ৪০ ঘণ্টা। কিন্তু রিপোর্ট করেছেন ৩৯ ঘণ্টা ৩০ মিনিট।
৬. Rule 32(2)(c) – Instrument Training জালিয়াতি (ATPL)
ATPL-এর জন্য আবশ্যক ১০ ঘণ্টার বিপরীতে তিনি করেছেন মাত্র ৩ ঘণ্টা ২০ মিনিট।
আইনি নোটিশে বলা হয়েছে— এসব জালিয়াতি ও ভঙ্গ সরাসরি aviation safety-কে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়, এবং তার লাইসেন্স void ab initio ঘোষণা করা উচিত। একই সাথে তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলা হয়েছে।
⸻
লিগ্যাল নোটিশ চুরি ও বেআইনি জবাব
বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং CAAB চেয়ারম্যানের উদ্দেশ্যে পাঠানো একটি আইনি নোটিশ, যেখানে আজিজের অনিয়মের প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছিল— সেই নোটিশ নিজেই চুরি করে বেআইনি উত্তর প্রদান করেন তিনি। এমনকি নিজেকে “হেড অব ব্রাইস সার্ভিস” পরিচয়ে স্বাক্ষর করেন, যদিও তিনি কখনো সেই পদে ছিলেন না। এটি সরকারি নথি চুরি ও জালিয়াতির গুরুতর উদাহরণ।
⸻
প্রশ্নের মুখে নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা
বিমান চলাচল খাতের একাধিক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে আজিজের মতো কর্মকর্তারা বারবার নিয়ম ভঙ্গ করেও রেহাই পাচ্ছেন। এতে বিমান নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে এবং সাধারণ যাত্রীদের জীবন ও সম্পদ হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
প্রাক্তন কর্মকর্তাদের একাংশ এখন দাবি তুলেছেন—
• অতিরিক্ত সরকারি ভর্তুকি অবিলম্বে ফেরত নিতে হবে
• সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে হবে
• CAR ’84 বিধি লঙ্ঘনের জন্য পাইলট লাইসেন্স বাতিল করতে হবে
⸻
উপসংহার
২০০১ সালের ভর্তুকি কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক স্বজনপ্রীতি ও জালিয়াতির ঘটনা প্রমাণ করছে— বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাত এখনো রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক দুর্নীতির ছায়ায় আবদ্ধ। এই সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের নিরাপত্তা বিপর্যয়ের ঝুঁকি এড়ানো যাবে না।