এনামুল হক রাশেদীঃ
★ লোভের ফাঁদে পড়ে বেশি লাভের আশায় শেষে নিঃস্ব হচ্ছে সবাই।
★ অনলাইন জুয়া, পর্নোগ্রাফি ও অনৈতিক বিজ্ঞাপন প্রচার প্রতিরোধে সরকারের কঠোর অবস্থান।
অনলাইন জুয়া, যে জুয়ায় সর্বনাশ ডেকে এনেছে পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে। দেশের শহর নগরের অলিতে গলিতে ছড়িয়ে প্রান্তিক জনপদের সর্বত্র এই মহামারী জুয়ার সয়লাব। সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন জুয়া মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশে জুয়া খেলা নিষিদ্ধ। পরিতাপের বিষয় হলো গ্রাম ও শহরে ব্যক্তিগতভাবে দু'জন বা ততোধিক ব্যক্তির মধ্যে ফুটবল ও ক্রিকেট খেলার ফলাফল বা অন্য কিছু নিয়ে বাজি ধরে বিজয়ীকে অর্থ বা মূল্যবান বস্তু আদান-প্রদানের প্রচলন দেখা যাচ্ছে। খালি চোখে এটি নিছক একটি চ্যালেঞ্জ মনে হলেও এর উদ্দেশ্য মহৎ বলা যায় না। বাজি ধরা, অর্থ কিংবা পণ্যের বিনিময়ে প্রতিযোগিতা, লটারি, অর্থ বা আর্থিক মূল্যমানের কোনো পণ্যের বিনিময়ে ভাগ্য কিংবা ভাগ্য ও দক্ষতার সংমিশ্রণে কোনো আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ খেলা ইত্যাদি জুয়ার অন্তর্ভুক্ত। রাস্তাঘাট, ক্লাব, অভিজাত এলাকা, এমনকি নিজেদের ঘরের ভেতরেও একা অথবা কয়েকজনের সঙ্গে জুয়ার আসর বসার ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। এই জুয়ায় গুটিকয়েক লোক লাভবান হলেও বেশিরভাগ মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। লোভের ফাঁদে পড়ে বেশি লাভের আশায় শেষে নিঃস্ব হয়। এভাবে তরুণ প্রজন্মসহ বিভিন্ন বয়সি মানুষেরা ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে- যা একটি দেশের উন্নয়নের জন্য বিরাট হুমকি। বর্তমানে চাকরির বাজারে প্রয়োজন যুগোপযোগী দক্ষতা অর্জন কিন্তু জুয়ায় আসক্ত তরুণেরা দক্ষতা অর্জনের চেয়ে সহজে অর্থলাভের আশায় জুয়া খেলতে অধিক আগ্রহী। কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমে চাকরি পাওয়া বা ব্যবসায় অগ্রগতি করার ধৈর্য কমে যাওয়ার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান যোগ্য লোক না পেয়ে দেশে এত বেকার থাকতেও বিদেশিদের উচ্চ বেতনে কাজে রাখতে বাধ্য হচ্ছে, যা কখনোই কাম্য নয়।
অনলাইন জুয়া, পর্নোগ্রাফি ও অনৈতিক বিজ্ঞাপন প্রচার প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের জন্য জরুরি নির্দেশনাও জারি করা হয়েছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকার দেশের সাইবার স্পেসকে নিরাপদ, নৈতিক ও প্রজন্মবান্ধব রাখতে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কিছু ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় জুয়া, বেটিং ও পর্নোগ্রাফি সম্পর্কিত বিজ্ঞাপন ও প্রমোশনাল কনটেন্ট প্রচার করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রম ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ এবং ‘পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২’-এর পরিপন্থি ও দণ্ডনীয় অপরাধ।
অধ্যাদেশের ধারা ২০(১) ও ২৫(১) অনুযায়ী, জুয়া, বেটিং বা পর্নোগ্রাফি প্রচার, বিজ্ঞাপন প্রকাশ কিংবা উৎসাহ প্রদান করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে উল্লেখ করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই ধরনের কার্যকলাপ তরুণ সমাজের নৈতিক বিকাশ, সামাজিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক বন্ধনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ কারণে সরকার ও জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি (এনসিএসএ) অনলাইন জুয়া, পর্নোগ্রাফি ও অনৈতিক বিজ্ঞাপন প্রতিরোধে একাধিক নির্দেশনা দিয়েছে।
নির্দেশনা সমূহ
দেশের সব পত্রিকা, অনলাইন পোর্টাল ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে সতর্ক করা হয়েছে— তারা যেন গুগল অ্যাডসেন্সসহ কোনো বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্মে পর্নোগ্রাফি, জুয়া বা বেটিং সম্পর্কিত বিজ্ঞাপন প্রচার না করে। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট সাইটের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মিডিয়া সেলিব্রিটি, ইনফ্লুয়েন্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, তারা যেন কোনোভাবেই জুয়া, বেটিং বা অনৈতিক পণ্যের বিজ্ঞাপনে অংশগ্রহণ না করেন।
দেশি ও বিদেশি ওয়েবসাইট, অ্যাপ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকেও একই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, অনৈতিক কনটেন্ট প্রচার করা হলে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট বা অ্যাপের বিরুদ্ধে ব্লকিং, জরিমানা বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এছাড়া মোবাইল কোম্পানি, আইএসপি, গুগল অ্যাডসেন্স, মেটা অ্যাডসহ আন্তর্জাতিক বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্মগুলোকে স্থানীয় আইন মেনে পপ-আপ ব্লকিং ও ফিল্টারিং নীতি কঠোরভাবে অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, প্রতিষ্ঠানগুলোকে ওয়েবসাইট বা অ্যাপে ডিফল্ট অ্যাডসেন্স চালু না রেখে কাস্টমাইজড করতে হবে, যাতে জুয়া, পর্ন বা গ্যাম্বলিং সম্পর্কিত বিজ্ঞাপন বা পপ-আপ না আসে।
সরকার জানিয়েছে, জুয়ার বিজ্ঞাপন প্রচার করলেই ১৯ অক্টোবর (রোববার) থেকে বিনা নোটিশে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট বা নিউজ পোর্টাল ব্লক করে দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে ক্রিকইনফো, জনকণ্ঠ, ঢাকা পোস্টসহ বেশ কয়েকটি পোর্টাল তাদের বিজ্ঞাপন নীতিমালা পরিবর্তন করেছে বলে জানানো হয়।
৩৩১টি অনলাইন জুয়ার সাইট বন্ধ
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) জানায়, ডিজিটাল নিরাপত্তা সেলের নিয়মিত নজরদারির অংশ হিসেবে সম্প্রতি ৩৩১টি অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট দেশের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক থেকে বন্ধ করা হয়েছে।
এছাড়া অনলাইন জুয়া সংক্রান্ত ১৫০টি গুগল অ্যাপ বন্ধের অনুরোধ করা হলে গুগল কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ১৪টি অ্যাপ সরিয়ে দিয়েছে।
ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমে জুয়া প্রচারের অভিযোগে ২৭টি ফেসবুক ও ৬৯টি ইউটিউব লিংক বন্ধের জন্য রিপোর্ট করা হলে ১৭টি করে লিংক ইতোমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে।
বিটিআরসি জানায়, অপরাধীরা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে জুয়ায় অর্থ লেনদেন করছে এবং কিছু চক্র এই পথেই কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অব্যাহত অভিযানে প্রকাশ্যে জুয়ার হার কমলেও অনলাইনে এর প্রবণতা বাড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়। তরুণ-তরুণীদের মধ্যে অনলাইন জুয়ার আসক্তি বাড়ছে, যা পরিবার ও সমাজের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা— সিআইডি, বিটিআরসি, এনসিএসএ, এনটিএমসি, এনএসআই ও বিএফআইইউ— যৌথভাবে এ কার্যক্রমে নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে এবং সাইবার স্পেসকে নৈতিক ও প্রজন্মবান্ধব রাখতে কঠোর পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে।
এ জাতীয় আরো খবর...