এনামুল হক রাশেদীঃ
★ ভোটারদের কাছে সাংগঠনিক পরিচয়ের ছেয়ে প্রার্থীদের মেধা-চরিত্র-নৈতিকতা, চিন্তা-চেতনা, নেতৃত্বের ইতিবাচক গুনাবলী, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের সাথে সম্পৃক্ততা সর্বোপরি জুলাই বিপ্লবের স্পিরিটকে ধারন বিষয় প্রাধান্য পাবে এটা নিশ্চিত বলা যায়।
প্রকৃতির কন্যা চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড়ঘেরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচন। চাকসুর এই ভোটযুদ্ধকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনার পারদ তুঙ্গে। এবার কেন্দ্রীয় সংসদ ও হল সংসদ মিলিয়ে মোট ২৭ হাজার ৬৩৪ জন ভোটারের বিপরীতে প্রার্থী হয়েছেন ১১৬২ জন। অর্থাৎ প্রতি ২৩ ভোটারের মধ্যে একজন প্রার্থী।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ মোট ৯৩১ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর আগে ১ হাজার ১৬৪ জন প্রার্থী মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করলেও ২৩৩ জন ফরম জমা দেননি। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের জন্য ৪২৯টি এবং হল সংসদের জন্য ৫০২টি মনোনয়ন জমা পড়ে। ছাত্র হলের প্রার্থী ৩৫৬ জন ও ছাত্রী হলের প্রার্থী ১৪৬ জন।
এদিকে তফসিলে আংশিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন তফসিল অনুযায়ী মনোনয়ন যাচাই-বাছাই হবে ২১ সেপ্টেম্বর, প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ ২২ সেপ্টেম্বর, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার ২৩ সেপ্টেম্বর, আপত্তি গ্রহণ ও নিষ্পত্তির শেষ তারিখ ২৪ সেপ্টেম্বর এবং চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হবে ২৫ সেপ্টেম্বর। আগামী ১২ অক্টোবর সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে ভোটগ্রহণ। ভোট শেষে গণনা শুরু হবে। ১৯৯০ সালের পর ৩৫ বছর পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
দ্বি-মুখী লড়াইয়ের ইংগিতঃ
চাকসু নির্বাচনে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করেছে দুটি প্রধান ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। বৃহস্পতিবার বিকেলে ক্যাম্পাসের জারুলতলায় সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় মানবকল্যাণ সম্পাদক সাইদুল ইসলাম ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের ঘোষণা দেন। প্যানেলে ভিপি পদে মনোনয়ন পেয়েছেন ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ইব্রাহিম হোসেন রনি, জিএস পদে সাঈদ বিন হাবিব এবং এজিএস পদে সাজ্জাদ হোসেন মুন্না।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবী চত্বরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির ছাত্রদলের প্যানেল ঘোষণা করেন। তাদের প্যানেলে ভিপি পদে রয়েছেন দর্শন বিভাগের সাজ্জাদ হোসেন হৃদয়, জিএস পদে স্পোর্টস সায়েন্স বিভাগের শাফায়াত হোসেন এবং এজিএস পদে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের আইয়ুবুর রহমান তৌফিক।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী ছাত্রশিবিরের আধিপত্য বরাবরই বজায় ছিল। ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনের পর ছাত্র শিবিরের প্যানেলে ইতিবাচক ঢেউ নতুন মাত্রা যোগ করবে চাকসু নির্বাচনে। ছাত্রশিবির তাদের প্যানেলে শাখা কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে রাখেনি। ভিপি পদে জুলাই বিপ্লবে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করা পরিচিত মুখ ইব্রাহিম হোসেন রনিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। ৫ আগস্টের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ জনপ্রিয়তার সাথে আলোচনায় এসেছিলেন সাঈদ বিন হাবিব। ‘জনপ্রিয়’ সেই মুখকেই জিএস পদে প্রার্থী করেছে ছাত্রশিবির। প্যানেলে সনাতনী শিক্ষার্থী, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও পাঁচ নারী শিক্ষার্থী রয়েছেন। অন্যদিকে ছাত্রদল প্যানেলে ২০১৯ সালের ২৩ জানুয়ারি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হাতে ব্যাপক মারধরের শিকার তখনকার ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন হৃদয়কে করা হয়েছে ভিপি প্রার্থী, চবিতে ছাত্রদলের গুরুত্বপূর্ণ পদে এর আগে চট্টগ্রামের বাইরের কাউকে তেমন একটা ভাবা হতো না, এবার জিএস পদে মনোনয়ন পেয়েছেন যশোরের কেশবপুরের ছেলে মো. শাফায়াত হোসেন।
বাগছাসের মূল অংশ এবার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না, তবে একটি অংশ স্বতন্ত্র প্যানেলে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এছাড়া বামপন্থী জোটসহ আরও কয়েকটি স্বতন্ত্র প্যানেল ভোটের মাঠে রয়েছে। নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্যানেলগুলো হলো—
ছাত্রদলের একক প্যানেল, ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’, বৈচিত্র্যের ঐক্য, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন-সমর্থিত ‘সচেতন শিক্ষার্থী সংসদ’, স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন, স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী জোট, সার্বভৌম শিক্ষার্থী ঐক্য, চাকসু ফর র্যাপিড চেঞ্জ, অহিংস শিক্ষার্থী ঐক্য ও দ্রোহ পর্ষদ।
জয়-পরাজয়ে সুইং ভোটার ফ্যাক্টর ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলীয় কর্মী বাহিনীর বাইরে বিপুলসংখ্যক ভোটার ‘সুইং ভোটার’। তাদের কাছে সাংগঠনিক পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীদের মেধা, চরিত্র, নৈতিকতা, নেতৃত্বগুণ এবং জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট গুরুত্ব পাবে। এছাড়াও আবাসন সংকট, শাটল ট্রেনের বগি সংকট, হলের নিম্নমানের খাবার ইস্যুতে প্রার্থীদের ইশতেহার ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, জাতীয় রাজনীতির কৌশল, এসব বিষয়কেও সুইং ভোটাররা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে দ্বি-মুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে এই সুইং ভোটাররাই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ জাতীয় আরো খবর...