কুলাউড়া উপজেলা প্রতিনিধি: মাহফুজুর রহমান মাহি,
পাকা ধানের হাসি ফোটার আগেই কুলাউড়ার কৃষকদের মুখে নেমে এসেছে হতাশা। ‘মাজরা’ নামের এক ভয়াবহ পোকা একরের পর একর জমির সবুজ ধানক্ষেতকে ধূসর করে দিচ্ছে চোখের সামনে। অথচ সহায়তার হাত বাড়াচ্ছে না কেউ।
চলতি আমন মৌসুমে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কৃষকরা ব্রি ধান-৫১, বিআর-২২সহ বিভিন্ন জাতের ধান রোপণ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ধানের ফলনও ভালো হয়েছিল। কিন্তু ধান কাটার আগমুহূর্তে ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়া মাজরা পোকার আক্রমণে ধানের শীষ শুকিয়ে যাচ্ছে, পাকা ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে কৃষকের পরিশ্রম যেন চোখের সামনে ধুলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার ভুকশিমইল, জয়চণ্ডি, টিলাগাঁও ও রাউৎগাঁও ইউনিয়নের বহু মাঠে মাজরা পোকার ভয়াবহ প্রকোপ দেখা দিয়েছে। শুধু মাজরা নয়, অন্যান্য পোকামাকড়ও আক্রমণ করছে ধানের গাছ।
ভুকশিমইলের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা নিজেরা চেষ্টা করছি, বিভিন্ন ওষুধ ব্যবহার করছি, কিন্তু তাতে কাজ হচ্ছে না। কৃষি অফিস থেকে কেউ আসছে না। যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, আমাদের ধান একটাও ঘরে তোলা যাবে না।”
রাউৎগাঁওয়ের কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, “ধান কাটার সময় ঘনিয়ে এসেছে। কিন্তু পোকার কারণে গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে। নিজের টাকায় ওষুধ কিনে দিচ্ছি, তবু কোনো লাভ নেই। সরকার যদি এখন পাশে না দাঁড়ায়, পথে বসা ছাড়া উপায় থাকবে না।”
জয়চণ্ডির কৃষক জসিম উদ্দিন বলেন, “আমরা ছোট কৃষক। ঋণ করে চাষাবাদ করি। এই অবস্থা চলতে থাকলে ঋণ শোধ করা তো দূরের কথা, সংসার চালানোই কঠিন হয়ে যাবে।”
কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ কর্মকর্তারা এখনো তেমন তৎপর নন। অনেক কৃষক জানেনই না কোন ওষুধ কার্যকরভাবে কাজ করে বা কীভাবে তা প্রয়োগ করতে হয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল মোমিন বলেন, “ধানের পোকা ধরবেই, এটা স্বাভাবিক একটি বিষয়। আমরা যতটা পারছি নজর রাখছি, তবে জনবল সংকটের কারণে সব এলাকায় একসাথে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। যেখানে ৪০ জন মাঠকর্মী থাকা প্রয়োজন, সেখানে মাত্র ১৪ জন রয়েছেন।”
তবে স্থানীয় কৃষকরা মনে করেন, জনবল সংকটের অজুহাত না দেখিয়ে ইউনিয়নভিত্তিক সচেতনতামূলক সভা বা প্রশিক্ষণ আয়োজনের মাধ্যমে কৃষকদের সহায়তা দেওয়া সম্ভব। এতে সমস্যা মোকাবিলায় প্রস্তুতি ও সচেতনতা দুটোই বাড়বে।
কৃষকদের আশঙ্কা—যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে এ বছর কুলাউড়ায় অন্তত কয়েক কোটি টাকার ধানের ক্ষতি হতে পারে।
মাজরা পোকার আক্রমণে যখন কৃষকের ঘরে ঘরে নেমে এসেছে হতাশা, তখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ—সঠিক পরামর্শ, দ্রুত প্রতিকার, আর মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের কার্যকর উপস্থিতি।
কৃষকের ঘরে আবার হাসি ফোটাতে এখন সময়ই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
এ জাতীয় আরো খবর...