প্রতিনিধি: আর,টি হাসান, মুকসুদপুর গোপালগঞ্জ
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর যেন এক দুর্ভোগের নাম। পৌরসভা এবং এর প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রের সড়কগুলো দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারহীন থেকে মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) এবং পৌর কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো এলাকা জুড়ে তৈরি হচ্ছে অবর্ণনীয় জনদুর্ভোগ। খানাখন্দে ভরা সড়কগুলো বৃষ্টির পানিতে ছোট ছোট জলাশয়ে পরিণত হওয়ায় শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, যানবাহন চালক থেকে শুরু করে জরুরি রোগী পরিবহন—সবকিছুই স্থবির হয়ে পড়েছে। বারবার দায়সারা সংস্কারে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী এখন একটি স্থায়ী সমাধানের জন্য কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মুকসুদপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রের সড়কগুলোর অবস্থা সবচেয়ে করুণ। সওজ-এর অধীনস্থ চৌরঙ্গী মোড়, কলেজ মোড় থেকে সোনালী ব্যাংক হয়ে কমলাপুর ব্রিজ পর্যন্ত সড়ক এবং পৌরসভার আওতাধীন পোস্ট অফিস রোড, কেজি স্কুল সংলগ্ন সড়ক, ফরিদ মিয়া মার্কেট থেকে গোপীনাথপুর তেরাইছ মোড় পর্যন্ত রাস্তার অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। বড় বড় গর্তে জমে থাকা কাদা-পানি মাড়িয়ে চলাচল করাই দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে।
এই বেহাল সড়কের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। মুকসুদপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী শাওন জানায়, "প্রতিদিন কাদাপানি মাড়িয়ে স্কুলে যেতে হয়। গাড়ির চাকার পানিতে স্কুল ড্রেস নষ্ট হয়ে গেলে ক্লাসে মন বসে না। অনেক সময় পিছলে পড়ে বই-খাতা নষ্ট হয়েছে। এই রাস্তায় চলতে এখন ভয় লাগে।"
দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল রিকশাচালক শুকুর আলী মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, "এই রাস্তায় রিকশা চালানো যে কী কষ্টের! চাকা গর্তে পড়লে মনে হয় রিকশা ভাইঙা যাইব। যাত্রীরাও ভাঙা রাস্তার কারণে চড়তে চায় না, আর অসুস্থ রোগী থাকলে তো কথাই নাই। আমাদের মতো দিনমজুরদের পেটে লাথি পড়ছে।"
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয় জরুরি রোগী পরিবহনের সময়। এই ভাঙাচোরা রাস্তা পেরিয়ে মুমূর্ষু রোগীদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। খানাখন্দ পেরোতে গিয়ে অ্যাম্বুলেন্স বা অটো লাফাতে থাকায় রোগীর যন্ত্রণা বহুগুণে বেড়ে যায়। বাজারের ঔষধ ব্যবসায়ী ইমন মৃধা বলেন, "এই ভাঙা রাস্তা দিয়ে রোগীদের নিয়ে যাওয়া যে কী যন্ত্রণা, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবে না। অনেক সময় যানজটের কারণে গোল্ডেন আওয়ার পার হয়ে যায়, যা রোগীর জীবনকে বিপন্ন করে তোলে।"
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই দুর্ভোগের মূল কারণ পৌরসভা এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতা। মুকসুদপুর পৌরসভার প্রকৌশলী সদানন্দ রায় জানান, "কলেজ মোড় থেকে কমলাপুর ব্রিজ পর্যন্ত সড়কটি সওজ-এর আওতাধীন। এছাড়া পৌরসভার নিজস্ব রাস্তা সংস্কারের জন্য পর্যাপ্ত তহবিল নেই। নতুন প্রকল্প পেলে কাজ করা হবে।"
তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ, দুই সংস্থার মধ্যে দীর্ঘদিনের রশি টানাটানির কারণেই কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। বারবার আবেদন-নিবেদন করেও কোনো ফল মেলেনি। একজন ক্ষুব্ধ চাকরিজীবী বলেন, "আমরা আর প্রতিশ্রুতি বা অস্থায়ী মেরামত চাই না, টেকসই কাজ দেখতে চাই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের জোর দাবি, মুকসুদপুর বাজারের এই প্রধান সমস্যাটি সমাধানে যেন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে একটি স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।"
অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আসন্ন বর্ষায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা করছেন ভুক্তভোগীরা। এখন দেখার বিষয়, মুকসুদপুরবাসীর এই দুর্ভোগ লাঘবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কবে নাগাদ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
এ জাতীয় আরো খবর...