তুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও দেশের শেয়ারবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর দীর্ঘ খরা কাটেনি। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এখনো নতুন কোনো কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দেয়নি। যদিও শেয়ারবাজার পুনরুজ্জীবিত করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আগ্রহ আছে, আবেদন নেই
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী কোম্পানি শেয়ারবাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহে আগ্রহী। তবে সেই আগ্রহ এখনো আনুষ্ঠানিক আইপিও আবেদনে রূপ নেয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন মার্চেন্ট ব্যাংকার জানান, তারা একাধিক সম্ভাব্য কোম্পানিকে আইপিওর জন্য প্রস্তুত করছেন। তবে নিয়ন্ত্রক কাঠামো নিয়ে আরও স্পষ্টতা না আসা পর্যন্ত অনেক কোম্পানি আবেদন জমা দিতে অপেক্ষা করছে।
বাজারে সম্ভাব্য আইপিও প্রার্থী হিসেবে বিআরবি, ডিবিএল, সিটি ও কনফিডেন্সসহ কয়েকটি বড় ব্যবসায়িক গ্রুপের নাম আলোচনায় রয়েছে। ফলে একদিকে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ রয়েছে, অন্যদিকে মার্চেন্ট ব্যাংকাররাও প্রস্তুতি নিচ্ছেন—কিন্তু নিয়ন্ত্রকের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন পৌঁছাচ্ছে না।
নতুন সরকার, নতুন কমিশন, নতুন নিয়ম
নতুন বিএসইসি কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর বড় ও মানসম্মত কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার ওপর জোর দিয়েছে। বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান সম্প্রতি বলেছেন, দেশে অনেক প্রতিষ্ঠিত দেশীয় ও বহুজাতিক কোম্পানি রয়েছে, যাদের তালিকাভুক্তি শেয়ারবাজারকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
আগামী ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনার লক্ষ্য রয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন। স্বেচ্ছায় তালিকাভুক্তির উদ্যোগ সফল না হলে আইনি ক্ষমতা ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনায় আসতে পারে বলে তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
প্রায় হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব বাতিল
বাজারসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের মার্চের পর বিভিন্ন পর্যায়ে আইপিও আবেদনসহ প্রায় ১৮টি পাবলিক অফার প্রস্তাব বাতিল বা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে শেয়ারবাজার থেকে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা সম্ভব হতো।
প্রাথমিক বাজারের সংকটের চিত্র উঠে এসেছে বার্ষিক তহবিল সংগ্রহের পরিসংখ্যানেও। ২০২৪ সালে চারটি কোম্পানি আইপিওর মাধ্যমে ৬৪৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। এর আগের বছর ২০২৩ সালে চারটি কোম্পানি সংগ্রহ করেছিল প্রায় ২০২ কোটি টাকা।
২০২২ সালে ছয়টি কোম্পানি আইপিওর মাধ্যমে ৬২৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা সংগ্রহ করেছিল। আর ২০২১ সালে ১৫টি কোম্পানি শেয়ারবাজার থেকে তুলেছিল ১ হাজার ৮৫৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।
কেন আইপিওতে আসতে চাইছে না কোম্পানিগুলো?
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইপিও খরা দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে কোম্পানির মূল্যায়ন অন্যতম। উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, অনুকূল মূল্য না পেলে আইপিওর মাধ্যমে মালিকানার অংশ ছেড়ে দিতে গিয়ে তাদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এর পাশাপাশি আইপিও কাঠামোয় বারবার পরিবর্তন এবং নিয়ন্ত্রক নীতির অনিশ্চয়তাও কোম্পানিগুলোকে সতর্ক করে তুলেছে। ফলে অনেক সম্ভাব্য ইস্যুয়ার আনুষ্ঠানিক আবেদন করার আগে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
তালিকাভুক্তির পর বাড়তি কমপ্লায়েন্সের চাপ নিয়েও কোম্পানিগুলোর উদ্বেগ রয়েছে। আর্থিক প্রতিবেদন, নিরীক্ষা, করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগসহ বিভিন্ন বাধ্যবাধকতা পালন করতে হয় তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে।
এ ছাড়া আইপিও থেকে সংগৃহীত অর্থ ব্যবহারে আরও বেশি স্বাধীনতা চান উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি উচ্চ সুদের ব্যাংকঋণ পরিশোধে আইপিওর অর্থ ব্যবহারের সুযোগ চান তারা।
সংকট এখন অনুমোদনে নয়, আইপিওর পাইপলাইনে
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের আইপিও সংকট এখন শুধু অনুমোদনের পর্যায়ে নেই; বরং নতুন আবেদন তৈরির পাইপলাইনই কার্যত শূন্য। বর্তমানে বিএসইসির কাছে অনুমোদনের অপেক্ষায় কোনো আইপিও আবেদন নেই।
দেশে ৬৬টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত মার্চেন্ট ব্যাংক সম্ভাব্য ইস্যু কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কাজ করলেও নিয়ন্ত্রক কাঠামো আরও স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য না হওয়া পর্যন্ত অনেক প্রতিষ্ঠান অপেক্ষা করছে।
এই পরিস্থিতি কাটাতে শেয়ারবাজার সংস্কার টাস্কফোর্স আইপিও প্রক্রিয়া আরও সহজ করার সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রক্রিয়া সংক্ষিপ্ত করা, নিয়ন্ত্রক ফি কমানো, কমপ্লায়েন্সের জটিলতা হ্রাস এবং ডিজিটালভাবে আবেদন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা।
ফলে সরকারের পাশাপাশি বিএসইসির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি স্থিতিশীল ও কার্যকর কাঠামো তৈরি করা, যাতে মানসম্মত কোম্পানিগুলো প্রাথমিক আগ্রহের পর্যায় থেকে বেরিয়ে আনুষ্ঠানিক আইপিও আবেদন করে। একই সঙ্গে নতুন ইস্যুয়ারের পাইপলাইন সচল করাই হবে দেশের শেয়ারবাজারের প্রাথমিক বাজার পুনরুদ্ধারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।